মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে মনুনদী প্রকল্পের অধীনে মৎস চাষের উদ্যোগ গ্রহন করেছে মমরুজপুর বরোপিট সমিতি। কৃষিজ আয়ের ২৪ দশমিক ৪১ ভাগ আসে মৎস খাত থেকে এবং জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৩ দশমিক ৬১ ভাগ। তাছাড়া মাছ প্রাণিজ আমিষের ৬০ ভাগ যোগান দেয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এ খাতের বিশেষ অবদান উল্লেখযোগ্য। “মাছ চাষে গড়বো দেশ, বদলে দেব বাংলাদেশ”। “করিব মৎস চাষ , সুখে থাকিব বার মাস”। ‘‘মাছ মারিব, খাইব সুখে’’। এই প্রবাদটা আমাদের মাছে ভাতে ভাঙালির অজানা নয়। অনেকেই বেকার হয়ে পরিবারের উপর নির্ভরশীল থাকেন। আজকাল চাকরির সুযোগ নেওয়াটা সকলের জোটে না। মাছ চাষের জন্য নদী-নালা-পুকুরের অভাব নেই এই সোনার বাংলাদেশে। পুষ্টিহীনতা দূর করতে বর্তমানে সারা দেশে যে পরিমাণ মাছ, মাংস, দুধ, ডিম উৎপাদিত হচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমিষের চাহিদা মেটাতে মৎস্য সম্পদের ভৃমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমকালীন বিশ্ব প্রায় সম্পূর্ণ প্রযুক্তি নির্ভর। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ও চাহিদার কারণে সবক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ অনেক এগিয়ে গেছে। নতুন প্রযুক্তির বিকাশ অনেক প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধি দিয়েছে কিন্তু এসব প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের অভাবে বিকাশশীল দেশগুলোর মধ্যে আমরা এখনও অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি।এ দেশে আগের তুলনায় মৎস্য চাষ বৃদ্ধি পেলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। দেশের সব জলাভূমিতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ করা গেলে মৎস্য সম্পদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। সারা বিশ্বের উৎপাদন কৌশল এখন বাণিজ্যভিত্তিক। কম শ্রম ও পুঁজি বিনিয়োগ করে অধিক মুনাফা অর্জন এর মূল লক্ষ্য। মৎস্য সম্পদের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম নেই। বিশ্বের সব দেশে এখন আধুনিক পদ্ধতিতে উন্নত জাতের মাছ চাষ হচ্ছে। গড়ে উঠেছে উন্নত মৎস্য খামার। প্রযুক্তি যেমন সহজ তেমনি দরিদ্র জনগণের জন্য উপযোগী। এ দেশের বেশিরভাগ লোক কৃষিজীবী এবং গ্রামে বাস করে। মৎস্য চাষ এসব গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক আয় রোজগারের একটি অংশ। প্রতি বাড়ির আনাচে-কানাচে পতিত পুকুরে মৎস্য চাষ করা যায়। মৎস্য চাষে যে মনমানসিকতা প্রয়োজন এ দেশের মানুষের তা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু এদের পরিকল্পিত উপায়ে মৎস্য চাষে উদ্বুদ্ধ করা। মৎস্য চাষ প্রযুক্তি অত্যন্ত সহজ। এর সাহায্যে আমাদের দেশের শিক্ষিত ও নিরক্ষর লোকজন স্বাবলম্বী হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় মৎস্য চাষের জন্য প্রয়োজন উন্নত জাতের বা রোগমুক্ত পোনা, যা দ্রুত বাড়তে পারে। কিছু নিয়ম অনুসরণের মাধ্যমে মাছের পোনা কয়েক মাসের মধ্যে দ্রুত বাড়তে পারে। সদর উপজেলার মমরুজপুর বরোপিট সমিতির মৎস্য খামারে গিয়ে দেখা যায় এসব খামারে অসৎখ্য লোকজনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এলাকায় মাচ চাষ করে অনেকেরই ভাগ্য বদলও করতে সক্ষম হয়েছেন। বেকার যুবকরা প্রতিদিন কাজ করছে। অনেকে আবার মৎস চাষে ব্যক্তি উদ্যোগী স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য উদ্যোগী হয়েছেন। বিলে সাধারণত স্থানীয় মালিকানা এবং সরকারের খাসজমি বিদ্যমান থাকে। সে কারণে সরকার স্থানীয় বেকার যুবক ও দরিদ্র ব্যক্তিদের সমন্বয়ে দল গঠন করে এবং তাদের প্রশিক্ষণ আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে মাছ চাষ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে থাকে। মৌলভীবাজার পওর বিভাগ, বাপাউবো মৎস্য ইজারা ব্যবস্থাপনা কমিঠির কার্যবিবরণী সুত্রে জানা গেছে- সদর উপজেলার ৬৪নং জেএলস্থিত মমরুজপুর মৌজায় মনুনদী প্রকল্পের অধীন (২৬/৭৬-৭৭নং এল,এ,কেইস মূলে এক একর দশ শতক জলাশয় বিগত ২৬/০৪/২০০৭ খ্রিঃ টেন্ডার কমিঠি কর্তৃক তিন বছর মেয়াদে মমরুজপুর বরোপিট সমিতি গ্রুপের অনুকুলে ২০টি শর্তসাপেক্ষে ইজারা চুক্তিনামা স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিপত্র ও বোর্ডের সার্কুলার অনুয়ায়ী রাজস্ব নির্ধারন বিবরণী পরিশিষ্ট “খ” তালিকায় সমিতি কর্তৃক চুক্তিপত্রের নির্ধারিত রাজস্ব, ভ্যাট, আয়কর ও জামানত পরিশোধ করে বর্তমানেও মমরুজপুর বরোপিট সমিতি গ্রুপের দখলে মৎস্য চাষ কার্যক্রম চলমান। সর্বশেষ, গত ০৪/০৩/২০১৮ইং মৎস্য ইজারা ব্যবস্থাপনা কমিঠির সভায় তিন বছর মেয়াদে মনুনদী প্রকল্পের অধীনে জলাশয় নবায়ন অনুমোদন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন- মৌলভীবাজার পওর বিভাগ, বাপাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী, মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর সুনজিত কুমার চন্দ, জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ এ.বি.এম সাইফুজ্জামান, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস আকন্দ, হিসাব রক্ষন অফিসার মোঃ শওকত আলী, এসডিই মোঃ খালেদ বিন অলীদ ও সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা ও কমিঠির সদস্য সচিব সোহেল রানা রাজস্ব সার্ভেয়ার মোঃ ওমর ফারুক। বরোপিট সমিতির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন ফয়েজ ও সাধারন সম্পাদক কয়ছর আহমদ জানান- প্রথমবার মৎস চাষ করে তেমন লাভবান না হলেও এবার সমিতির মাধ্যমে এলাকায় বেকারত্ব দূর করতে মৎস্য চাষের সাথে সেই জলাশয়ে হাঁসের খামার, কলাগাছ বাগানসহ বিভিন্ন উদ্যাগ গ্রহন করেছি। একজন পাহারাদার সার্বক্ষনিক খামার দেখা শুনা করছে। মৎস্য খামারের শুরুতেই একটি চক্র আমার মৎস্য খামারে বিষ দিয়ে মাছ মেরে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লক্ষ টাকার ক্ষতি সাধন করে। গত ২০১৭ সালের ১ম দিকে বন্যা মৌসুমে অকাল বন্যায় ১১ থেকে ১২ লাখ টাকার মাছ ক্ষতি হয়েছে। ব্যাংক লোন ও ব্যাক্তি উদ্যাগে আবারও সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মান সম্পন্ন রেণু পোনা জলাশয়ে ছাড়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, এবছর সকল ক্ষয়-ক্ষতি পুষিয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা মুনাফা অর্জনের আশা রাখছি। সরকারের সঠিক পুষ্টপোষকতা ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সর্বান্তক সহযোগীতা কামনা করছি। মৌলভীবাজার পওর বিভাগ, বাপাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী জানান- মৎস্য ইজারা ব্যবস্থাপনা কমিঠির সভার সিদ্বান্ত মোতাবেক এ জলাশয় নবায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে দেশেও মাছের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিপুল পরিমান রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি খামারগুলো দেশে প্রাণীজ প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে বড় অবদান রাখছে। দেশের মৎস্য সম্পদ রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের পদক্ষেপ উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, জলমহালে সমাজভিত্তিক মাছ চাষ ব্যবস্থাপনা, মৎস্য আবাসস্থল উন্নয়ন, ভূমিতে মৎস্য চাষ ও অভয়াশ্রম স্থাপনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গুণগত মানসম্পন্ন মাছের পোনা উৎপাদনের জন্যও যুগোপযোগী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন জলমহাল নীতিমালা, মাছ চাষিদের মাঝে মানসম্পন্ন রেণু সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য মৎস্য হ্যাচারি আইন ও মৎস্য হ্যাচারি বিধিমালা, গুণগতমানের মৎস্য খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য মৎস্য খাদ্য খাদ্য ও পশুখাদ্য আইন এবং মৎস্য খাদ্য বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর মৎস্য চাষ ব্যবস্থাপনা ও সম্প্রসারণ মৎস্য চাষ ও অভয়াশ্রম স্থাপনসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নসহ সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ ধরণের বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন ও আহরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিপন্নপ্রায় মৎস্য প্রজাতির সংরক্ষণ, প্রজনন ও বংশ বিস্তারের জন্য মুক্ত জলাশয়ে অভয়াশ্রম স্থাপন ও এর সংরক্ষণে দেশের মৎস্য খাতের সঙ্গে সংশি¬ষ্ট সকলে আরও তৎপর হওয়ার আহবান জানান।
মৌলভীবাজারে মনুনদী প্রকল্পে মৎস চাষের উদ্যোগ,
Catagory : মৌলভীবাজার | তারিখ : মে, ১০, ২০১৮, ২:১৯ অপরাহ্ণ • ১ বার পঠিত






