উড়ে এসে জুড়ে বসে মোতাওয়াল্লী দাবি এক যুগের নেই আয়-ব্যয়ের হিসাব মসজিদের ওয়াকফকৃত জায়গা বিক্রি
হোসাইন আহমদ, মৌলভীবাজার থেকেঃ
উড়ে এসে জুড়ে বসে মৌলভীবাজারের ঐতিহাসিক সুলতানী আমলের খোজার মসজিদের মোতাওয়াল্লী দাবী করে এক যুগেরও বেশী সময় ধরে হরিলুট চালিয়ে যাচ্ছেন মোতাওয়াল্লী সৈয়দ মোজাহিদ আলীর পরিবার।
নিজেকে সৈয়দ আকবর আলীর বংশধর দাবী করে ওয়াক্ফ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এই মসজিদের মোতাওয়াল্লী হয়ে টাকার লোভে নানান অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন তিনি। তার বিরুদ্ধে রয়েছে মসজিদের টাকা আত্মসাত, ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তি ও গাছ বিক্রি এমনকি জালিয়াতি করে নিজ চাচাত বোনের জমি বিক্রিরও অভিযোগ।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার গয়ঘড় এলাকায় ঐতিহাসিক খোজার মসজিদটির অবস্থান। ইতিহাস ও মসজিদের খোদাই করা শিলালিপি থেকে জানা যায় ১৪৭৬ সালে সুলতানী আমলে বাংলার স্বাধীন সুলতান ইলিয়াস শাহ এর বংশধর রুকনুদ্দিন বরবক শাহের দ্বিতীয় পুত্র শামছুদ্দিন ইউসুফ শাহের সময়ে যুবরাজ মাহমুদ শাহ ও সেনাধ্যক্ষ সিকান্দর শাহের তত্ত¡াবধানে ঐতিহাসিক এই মসজিদ নির্মিতি হয়েছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ দিন পরিত্যক্ত থাকায় গাছপালা ও ময়লা আবর্জনায় মসজিদটি ভরে যায়। পরে ১৯৩৮ সালে ১০ বছর কাজ করে জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মরহুম পীর কামেল উদ্দিন শাহ ¯েøট ইটের খিলানের মাধ্যমে মসজিদের গম্বুজটি পুনঃনির্মাণ করে নামাজের উপযোগী করে তুলেন।
ঐতিহাসিক ওই মসজিদটি একনজর দেখার জন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটক ও ইতিহাসবীদরা আসলেও গত ৩০ বছর ধরে মসজিদের মোতাওয়াল্লী দ্ব›েদ্বর কারণে মসজিদটি ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। দ্ব›েদ্বর কারণে বর্তমানে মসজিদটি পরিচালনা করছেন সদর উপজেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা।
জানা যায়, ১৯৬০ সালে মসজিদটি সৈয়দ আকবর আলী ওয়াক্ফ এস্টেটের নামে বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসনের তালিকা ভুক্ত করা হয়। সৈয়দ আকবর আলীকে নিজেদের বংশধর দাবি করে সৈয়দ সিরাজুল ইসলামের পরিবার মোতাওয়াল্লা দাবি করছে। কিন্তু সদর উপজেলার বেকামোড়াও গ্রামের প্রবীণ মুরব্বি আব্দুল খালিক, গয়ঘড় এলাকাবাসী ও খোদ সৈয়দ সিরাজুল ইলসামের চাচী সৈয়দা কামরুন নেছা জানান সৈয়দ আকবর আলীর সাথে সৈয়দ সিরাজুল ইসলামের বংশধরের কোনো মিল নেই। আকবর আলীর কোনো ছেলে সন্তান না থাকায় তখনকার সময়ে সৈয়দ সিরাজুল ইসলামের দাদা কাটা কাপড়ের ব্যবসায়ী হিছাব আলী সদর উপজেলার বেকামোড়াও পীরের বাড়ি থেকে ওই বাড়িতে উঠে পরবর্তীতে আকবর আলীর বংশধর বলে দাবি করেন। ১৯৯৭ সালে মৌলভীবাজার জেলা ওয়াকফ অডিটর মোঃ মাহবুবুর রহমানের প্রতিবেদনেও একই তথ্য পাওয়া যায়।
১৯৭৩ সাল মছকির মিয়াকে সভাপতি ও মাহমুদ আলীকে সাধারণ সম্পাদক করে প্রথম কমিটি গঠন করে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় এলাকার মানুষ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম মোতাওয়াল্লী দাবি করে ওয়াকফ প্রশাসনে মামলা করলে ২০০৪ সালে মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব পান।
দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় মসজিদ পরিচালনা করে আসলেও নেই আয়-ব্যয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব। মসজিদের নামে ছিলনা কোনো ব্যাংক একাউন্ট। ওই সময়ে প্রবাসী ও স্থানীয়দের দানকৃত মোতাওয়াল্লীর পকেট কমিটি আত্মসাত করেছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। মাসিক এবং বার্ষিক কোনো হিসাব জনসম্মুখে পেশ করা হয়নি বলে তারা জানান। এলাকাবাসীদের অভিযোগ ওয়াকফ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে চলছে তাদের এমন রমরমা বাণিজ্য। মোতাওয়াল্লীকে এসকল অনিয়মে সহযোগীতা করছেন সাবেক ৪ বারের সাধারণ সম্পাদক আক্কাছ আলী। তিনি এলাকায় দাদন ব্যবসার সাথে জড়িত। এছাড়া সাবেক সভাপতি লন্ডন প্রবাসী মোবারক হোসেন মসজিদের পাশের বাড়ির এক সৌদি প্রবাসীর স্ত্রীর সাথে পরকিয়ায় জড়িয়ে পরে বিয়ে করেন। ওই কমিটির আরেক সদস্য আবুল কালাম হত্যা, অপহরণসহ বিভিন্ন মামলার আসামী হয়ে কারাবরণরত।
এমন অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করতে এবং ঐতিহাসিকমসজিদটি রক্ষা করতে এলাকাবাসী বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন, ইউএনও, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিক ব্যক্তিবর্গের কাছে আবেদন করেও মোতাওয়াল্লীর স্বেচ্চাচারীতা রুখতে পারেনি। সর্বশেষ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন চলতি বছরের ২৭ মার্চে ওয়াক্ফ প্রশাসন অনুমোদিত কমিটিকে দায়িত্ব হস্থান্তর করে সরকারী কর্মকর্তা এবং এলাকাবাসীর সম্বনয়ে ২০ সদস্য বিশিষ্ট একটি এডহক কমিটি গঠন করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মসজিদের ওয়াকফকৃত জায়গার পরিমাণ ৩০৮,৩০৭,২৪৪,২৪৫ ও ৫২৩ নং দাগে ১০৮ শতক। মাঠ জরিপে ৩০৯ নং দাগে ২৪ শতক জায়গা মসজিদের নামে থাকলে ওয়াকপ প্রশাসনের সম্পত্তির বিবরণীতে উল্লেখ নেই। কিন্তু বর্তমানে ৩০৯, ৩০৭, ও ৩০৮ নং দাগে মাত্র ৫৭ শত জায়গা আছে মসজিদের। বাকী ২৪৪, ২৪৫, ৫২৩ নং দাগের জায়গাগুরো বিক্রি করেন মোতাওয়াল্লী পরিবার। স্থানীয়দের অভিযোগ এই টাকার একটি অংশেরও নাকি ভাগ পেয়েছে ওয়াকফ কর্মকর্তা। বর্তমান মোতাওয়াল্লী সৈয়দ মোজাহিদ আলীর বাবা সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম ১৭ মার্চ ২০০৫ সালে নিজ চাচাতো বোন সৈয়দা সুলতানা বেগমের অগোচরে জালিয়াতি করে বিক্রি করেন সুলতানার পত্তিক সম্পত্তি। জমি বিক্রির দলীলে বিক্রেতা হিসেবে সৈয়দা সুলতানা বেগমরে নাম ও স্বাক্ষর থাকলেও এবিষয়ে সুলতানা কিছুই জানেননা।
মসজিদের জায়গা বিক্রি ও টাকা আত্মসাত করেই পেট ভরেনি মোতাওয়াল্লী পরিবারের। বিভিন্ন জাগয়া থেকে আগত দর্শনার্থীদের ছায়াদেয়ার জন্য মসজিদ প্রাঙ্গনে ছিল বিভিন্ন প্রজাতির বনজ ও ফলজ বৃক্ষ। কিন্তু মোতাওয়ালী টাকা আত্মসাতের লোভে ওয়াকফ প্রশাসনের নীতিমালা ভঙ্গ করে গত ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর এক মহালদারের কাছে গাছগুলো বিক্রি করেন। মহালদার কয়েকটি গাছ কাটার পর এলাকবাসী মৌলভীবাজার মডেল থানা অভিযোগ দিলে পুলিশ গাছ কাটা বন্ধ করে।
এবিষয়ে মোতাওয়াল্লী সৈয়দ মোজাহিদ আলীর সাথে সরাসরি কথা হলে তিনি যে সৈয়দ আকবর আলীর বংশধর এধরনের কোনো ডকুমেন্ট দেখাতে পারেননি। মসজিদের নামে কোনো ব্যাংক একাউন্ট আছে কিনা জানতে চাইলেও কিছু বলতে পারেননি। ওয়াকফের তালিকায় ১০৮ শতক জায়গা থাকলেও তিনি বলেন মসজিদের জায়গা মাত্র ৬০ শতক। ১ যুগ ধরে মুসল্লিদের দানকৃত টাকা আত্মসাতের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি মসুদ আহমদ বলেন, মোতাওয়াল্লী ও সাবেক কমিটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন ও স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সহযোগীতায় বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করলে মোতাওয়াল্লী ও তার কমিটির লোকজন এটি মেনে নিতে রাজি হননি। মৌলভীবাজার জেলা ওয়াকফ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের সাথে কথা হলে উনার যোগসাজসে টাকা আত্মসাত হচ্ছে বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন, মোতাওয়াল্লী সৈয়দ মোজাহিদ আলী সর্বশেষ এক বছরের হিসাব দেননি। অনুমতি না নিয়ে গাছ কাটার কথাও তিনি স্বীকার করেন। মসজিদের জায়গা অন্যের কাছে বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। খোজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
Catagory : ক্রাইম সংবাদ, মৌলভীবাজার | তারিখ : নভেম্বর, ২৪, ২০১৭, ৬:৩৫ অপরাহ্ণ • ৭ বার পঠিত






