আজ-  ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ৩রা জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি


সময় শিরোনাম:
«» আজ বৃহস্পতিবার বনানী ক্লাবে উদ্বোধন হবে মিউজিক্যাল ডকুমেন্টারি ‘রূপসী শ্রীমঙ্গল’ «» বগুড়া ‎শেরপুরে ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে গণপিটুনিতে এক যুবকের মৃত্যু «» বাংলাদেশ বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব নিয়ে বার্মিংহামে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত «» জুড়ীতে ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘরে দিনযাপন-সরকারি সহায়তা চান রামকৃষ্ণ তেলি পরিবার «» নওগাঁয় দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ «» National Human Rights Commission Act 2026 (Draft) «» বগুড়া সান্তাহারে একাডেমিক ভবনের ফলক উদ্বোধন  «» বগুড়া সান্তাহার কলসা স্কুলে সংবর্ধনা ও   অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত  «» শ্রীমঙ্গলে সিএনজি-মাইক্রো শ্রমিক সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ আহত «» নওগাঁয় শিক্ষকের মৃত্যুর খবর শুনে শিক্ষার্থীর মৃত্যু

২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী দিবস ও মঞ্চায়িত  ঘৃন্য যুদ্ধ নাটক

কে এস এম আরিফুল ইসলাম::

নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে নানা রকমের রটনা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন বাংলা বিহার উড়িষ্যার অন্যতম স্বাধীনচেতা নবাব। যিনি বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্রের কারণে স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারেননি।
আর ঐতিহাসিকদের মতে ১৭৫৭ সালের এইদিনে (২৩ জুন) নদিয়া জেলার পলাশীর প্রান্তরে রবার্ট ক্লাইভ, মীরজাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ চক্র এই কালো দিবসের জন্ম দেয়।১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আমবাগানের যুদ্ধে স্বাধীন বাংলার নবাব ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরকাছে পরাজিত হয়। যার ফলে প্রায় ২০০ বছরের জন্য বাংলা স্বাধীনতা হারায়। সেইজন্য প্রতি বছর সে জন্য ২৩ জুনপলাশী দিবস হিসাবে পালিত হয়।

পলাশী দিবস কি ::

১৭৫৭ সালের এইদিনে (২৩ জুন) নদিয়া জেলার পলাশীর আমবাগানে বাংলার সর্বশেষ স্বাধীন নবাব নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও লর্ড ক্লাইভের মধ্যে এক যুদ্ধ নাটক মঞ্চায়িত হয়। ইতহাসে যা পলাশীর যুদ্ধ নামে খ্যাত হলেও বাস্তবে তা ছিল নেহায়েত দাংগা।

যুদ্ধে স্বাধীন বাংলার নবাব ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরকাছে পরাজিত হন। ঘৃণিত কলঙ্কজনক প্রাসাদ প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে। আর এই ঘৃণিত কলঙ্কজনক এই প্রাসাদ প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অধ্যায় সৃষ্টির পেছনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল বিশ্বাসঘাতক জগৎ শেঠ, মীরজাফর, মাহতাব চাঁদ, উমিচাঁদ বা আমির চন্দ, মহারাজা স্বরূপচাঁদ, ইয়ার লতিফ, রায়দুর্লভ, ঘসেটি বেগমের ক্ষমতার লোভ।রাজা রাজবল্লভ, মহারাজ নন্দকুমার, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়, রানী ভবানী প্রমুখের কৌশলী চক্রও এর পেছনে প্রচ্ছন্ন ছিল।

যুদ্ধক্ষেত্রে এই স্বার্থান্বেষী ষড়যন্ত্রীদের শিকার ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিপাহসালার নবাবসিরাজউদ্দৌলা এবং তার বিশ্বস্ত সেনাপতি বকসী মীরমদন, প্রধান আমাত্য মোহনলাল কাশ্মিরী ও নবে সিং হাজারী।

ঐতিহাসিক পলাশীর যুদ্ধ::

সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। কিন্তু তা অন্যসব দিনের চেয়ে ছিল আলাদা। কারণ ওইদিন মুর্শিদাবাদ থেকে ১৫ ক্রোশ দক্ষিণে ভাগিরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যাসহ পুরো উপমহাদেশের স্বাধীনতার কবর রচিত হয়েছিল।

২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও লর্ড ক্লাইভের মধ্যে এক যুদ্ধ নাটক মঞ্চায়িত হয়। ইতহাসে যা পলাশীর যুদ্ধ নামে খ্যাত হলেও বাস্তবে তা ছিল দাংগা। ঐতিহাসিকদের মতে নবাববাহিনী একটি করে ঢিল ছুঁড়লেও ইংরেজ সেনারা গুঁড়ো হয়ে যেত, তাদের সংখ্যা এতই কম ছিল। এতে নবাব বাহিনীর পক্ষে সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৬৫ হাজার এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে ছিল মাত্র ৩ হাজার। কামানেও সিরাজদৌলার সংখ্যাধিক্য ছিল। যুদ্ধের ময়দানে নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি মীরজাফর ও তার অনুসারী প্রায় ৪৫ হাজার সৈন্য নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। ফলে যুদ্ধে স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির পরাজয় অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। যদিও সাহসী সেনাপতি মীরমদন এবং বিশ্বস্ত দেওয়ান মোহনলাল, ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রেকে সাথে নিয়ে প্রাণপণ লড়াই চালান। যুদ্ধে মীরমদন কামানের গোলার আঘাতে মারা যান এবং মোহনলাল আহত হন। মীরমদন মোহনলালের সেনারাই রবার্ট ক্লাইভের বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে ফেলেছিল প্রায়। কিন্তু নবাব সিরাজ মীরজাফরের ভুল এবং অসৎ পরামর্শে যুদ্ধ বন্ধ রাখার আদেশ দেন। এতে নবাববাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

যুদ্ধের ফলাফল::

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের সেবাদাসদের সাহায্যে এভাবেই বাংলায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এরপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দীর্ঘ ১৯০ বছর এদেশে শাসন শোষণ করে। কোটি কোটি টাকার অর্থ সম্পদইংল্যান্ডে পাচার করে। বাংলা থেকে লুটকৃত পুঁজির সাহায্যে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব ঘটে। আর এককালের প্রাচ্যের স্বর্গ সোনার বাংলা পরিণত হয় শ্মশান বাংলায়, স্থান পায় বিশ্বের দরিদ্রতম দেশে।

এ যুদ্ধের রাজনৈতিক ফলাফল ছিল ধ্বংসাত্মক ও সুদূরপ্রসারী। এ যুদ্ধের পরে বক্সারের যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাংলা ব্রিটিশদের অধিকারে চলে আসে। বাংলা অধিকারের পর ক্রমান্বয়ে ব্রিটিশরা পুরো ভারতবর্ষ এমনকি এশিয়ার অন্যান্য অংশও নিজেদের দখলে নিয়ে আসে।

পলাশীর রক্তাক্ত ইতিহাস, পরাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিসংগ্রামীদের পরাজয়ের ইতিহাস, ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস, ট্রাজেডি ও বেদনাময় এক শোক স্মৃতির ইতিহাস। এই নৃশংস ও কলঙ্কজনক ঘটনার মাধ্যমে কলকাতা কেন্দ্রিক একটি নতুন উঠতি পুজিঁপতি শ্রেণী ও রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে।

ইংরেজ ও তাদের এ দেশীয় দালালগোষ্ঠী দেশবাসীর ওপর একের পর এক আগ্রাসন চালায়। ফলে দেশীয় কৃষ্টি-সৃংস্কৃতি, শিল্প ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে। বিকাশমান ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরির ক্ষেত্রে তারা মরণ কামড় দেয়।

পলাশী বিপর্যয়ের পর শোষিত বঞ্চিত শ্রেণী একদিনের জন্যও স্বাধীনতা সংগ্রাম বন্ধ রাখেনি। এ জন্যই বৃটিশ কর্তৃপক্ষ সাধারণ জনগণকেই একমাত্র প্রতিপক্ষ মনে করত। ফলে দীর্ঘ দুইশ’ বছর ধরে আন্দোলন সংগ্রামের ফলে বৃটিশরা লেজ গুটাতে বাধ্য হয়।

পরে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্মলাভ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে নানা রকমের রটনা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন বাংলা বিহার উড়িষ্যার অন্যতম স্বাধীনচেতা নবাব। যিনি বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্রের কারণে স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারেননি।

লেখক::
কে এস এম আরিফুল ইসলাম
সাংবাদিক ও সিনিয়র সহকারী শিক্ষক
দারুল আজহার ইনস্টিটিউট
শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার।