মু. ইমাদ উদ দীন॥
তারা সবাই উঠতি বয়সী। ওদের একে অন্যের বয়সও প্রায় কাছাকাছি। দু’তিন জন ছাড়া সবাই শিক্ষার্থীও। কিন্তু এরই মধ্যে খুনের মামলায় নাম উঠেছে তাদের। হয়েছেন মৌলভীবাজারের আলোচিত জোড়া খুনের মামলার এজাহার ভুক্ত আসামী। গেল ৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাজনৈতিক দ্বন্ধে জোড়া খুন।
হঠাৎ এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনায় স্তম্ভিত মৌলভীবাজার শহর। এ ঘটনার নেপথ্যে কি ছিল। কারা এর সাথে ছিল জড়িত। তাদের বয়স কেমন ছিল। তারা পেশাদার খুনি কি না। এ ঘটনার আগে ও পরে এ বিষয়ে কারা মুঠোফোনে কথা বলেছে। জেলা জুড়ে এখন চলছে এমন নানা আলোচনা। ঘটনার অন্তরালের খবর জানতে যে যার মত অনুসন্ধানে ব্যস্ত। তবে রোববার এই জোড়া খুনের ঘটনায় মামলা হওয়ায় কিছুটা হলেও মিটে এ ব্যাপক কৌতুহল। এখন পুলিশ,পরিবার,সহপাঠী ও স্বজনদের তরফেও মিলছে নানা তথ্য উপাথ্য। এই ঘটনার পর পরই তার কারন অনুসন্ধান ও আসামী সনাক্ত করতে পুলিশ ছিল তৎপর। এই নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনায় সিলেটের ডিআইজি সহ পুলিশ প্রশাসনের লোকজন ছুটে যান নিহদের বাড়িতে। তারা শোকাবহ দুই পরিবারকে স্বান্তনা দিয়ে প্রকৃত ঘাতকদের দৃষ্ঠান্ত মূলক শাস্তির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন।
শনিবার সন্ধ্যার দিকে পুলিশ সনাক্ত করে সন্দেহভাজন সম্ভাব্য খুনিদের। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে সন্দেহভাজন এমন কয়েক জনের ছবিও প্রকাশ করে। তাদের ধরিয়ে দিতে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়। ওই তরুণদের ছবি দেখে অনেকেই বিস্মিত হন। উঠতি বয়সী এসব ছেলেদের ছবি দেখে এই ঘটনার নেপথ্যের খবর জানতে পুরো জেলাবাসী কৌতুহলী হয়ে উঠেন। আর শুক্রবার ভোর রাতেই ধরা পড়ে এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট সন্দেহ ভাজন একজন। যার জবানিতে মিলে এই হত্যাকান্ডের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তার দেওয়া তথ্য ও পুলিশের ৪টি টিমের মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানে একে একে অনেকটাই উন্মোচিত হতে থাকে এই জোড়া খুনের নেপথ্যের। নিহত ছাত্রলীগ নেতা শাবাব ও মাহির পরিবার মামলা করতে তেমন আগ্রহী ছিলোনা। এর কারন হিসেবে তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে বলেছিলেন দেশে কোন রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের মামলা আলোর মুখ দেখে না। তাই মামলায় জড়িয়ে সময় ও অর্থ ব্যয় করেও ন্যায় বিচার পাওয়া নিয়ে থাকতে হয় সন্দিহান। তাদের এমন হতাশাগ্রস্থ বক্তব্য শোনে পুলিশ তাদের আশ্বস্ত করে। তাদের এমন দৃঢ় আশ্বাসে ন্যায় বিচার পাওয়ার আশায় নিহত শাবাবের মা সেলিনা রহমান চৌধুরী বাদী হয়ে রোববার আনিসুল ইসলাম তুষার কে প্রধান আসামী করে ১২ জনের নাম উল্লোখসহ অজ্ঞাত আরো ৬-৭ জনকে আসামী করে মামলা করেন। মামলার এজাহারে এই হত্যাকান্ডের বিবরন ও আসামীদের নাম পরিচয় জেনে হতবাক হন সবাই। কারন তারা সবাই উঠতি বয়সী। ওদের একে অন্যের বয়সও প্রায় কাছাকাছি। এজাহারে নাম উল্লেখিত দের মধ্যে দু’জন ছাড়া অন্যরা সবাই শিক্ষার্থী। কিন্তু এরই মধ্যে খুনের মামলায় নাম উঠেছে তাদের। হয়েছেন মৌলভীবাজারের আলোচিত জোড়া খুনের মামলার এজাহার ভুক্ত আসামী। তাদের দল, মত ও গ্রুপ একই আর্দশের। সবাই ছিলেন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের অনুসারী। সিনিয়রদের পথে একই দলীয় আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে করছেন রাজনীতিও। তারা কেউ ছাত্রলীগের নেতা। কেউ সক্রিয় কর্মী। আবার কেউ একনিষ্ঠ সমর্থক। তবে সবচেয়ে বড় পরিচয় হল তারা একে অন্যের খুবই পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ। বন্ধু কিংবা সহপাঠী। কিন্তু দল মত এক হলেও দল ও গ্রুপে নিজেদের আদিপত্য বিস্তার করতে ভিতরে ভিতরে একে অপরের শত্রু। নিজ গ্রুপে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে করেছেন উপগ্রুপ।
সম্প্রতি তারা শহরের কলেজ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অধিক গুরুত্ব দিতেন স্কুল শিক্ষার্থীদের প্রতি। তারা অনেকেই শহরের সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ায় দলের কর্মী বানাতে টার্গেট ছিল ওই স্কুল। আর ওই স্কুলের কর্মী নিয়ে নিজ দলের গ্রুপ প্রধান নিহত শাবাব ও তুষারের মধ্যে দ্বন্ধ প্রকট হয়ে উঠে। তারা প্রায় বছর দিন থেকে অনেকটা মনস্তাতিক ভাবে ঘনিষ্ট বন্ধু থেকে শ্রত্রুতে পরিণত হন। আর এরই প্রেক্ষিতে ঘটনা ঘটে এমন জোড়া খুনের। এমন তথ্য নিহত শাবাবের পরিবার ও তার রাজনৈতিক ঘনিষ্টজনদের। মামলা দায়েরে পর এখন মুখ খুলছেন নিহদের পরিবার। তারা দৃঢ় কন্ঠে জানাচ্ছেন রাজনীতির কারনেই অল্প বয়সে বলি হয় তাদের সম্ভাবনাময়ী মেধাবী দু’সন্তান। যারা দুজনই ছিলেন ছাত্রলীগের সক্রিয় নেতা ও কর্মী। তবে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন ওরা ছাত্রলীগের কেউ নয়। আর সাধারণ সম্পাদক শাবাবকে তার দলের কর্মী স্বীকার করলেও মাহিকে দলের কেউ নয় বলছেন। তবে এই মামলার এজাহার ভুক্ত আসামীরা সকলেই বয়সে তরুণ, শিক্ষার্থী আর ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, সক্রিয় সমর্থক ও একই গ্রুপের অনুসারী। এমনটি জানিয়েছেন নিহতদের পরিবার,সহপাঠী ও মামলার বাদী।
এই ঘটনায় নিহত ছাত্রলীগ নেতা শাবাবের মা সেলিনা রহমান চৌধুরীর দায়ের করা হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামীরা হলেন শহরের বড়হাট এলাকার আনিসুল ইসলাম তুষার (২৭), শমসের নগর রোডের আরাফাত রহমান (২০), সৈয়দ সৌমিক (২২), রাজনগর উপজেলার চকিরাই গ্রামের আশফাকুল ইসলাম মাহদী (২০),মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রবাসের শিক্ষার্থী জামিল (১৮), সদর উপজেলার পাগুলিয়া এলাকার সনি হায়দার (২০), বেরিচর পশ্চিম বাজার এলাকার রুবেল মিয়া (২৮),সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থী কনক দাশ (১৮), প্রতীক হাসান (২০), সদর উপজেলার মোকাম বাজার এলাকার হ্রদয় আহমদ (২১), রাজনগরের মহলাল এলাকার তামিম হাসান (২০), শহরের র্কোট এলাকার ফাহিম মুনতাসির (২০)। এদিকে থানা সুত্রে জানা যায় পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক মঞ্জুরকৃত এই মামলার এজাহারভুক্ত ৩ আসামীর ২ দিনের রিমান্ড মঙ্গলবার শেষ হয়েছে। রিমান্ড শেষে তাদেরকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে এই মামলার অনান্য আসামী ও এই খুনের ঘটনার আগে পরে সরাসরি কিংবা মুঠোফোনে ঘাতকদের পরামর্শ দিয়ে সহযোগীতাকারীদের খোঁজে বের করে তাদেরকেও গ্রেফতার করতে তৎপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহীনি।






