যক্ষার ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেটের চা শিল্পাঞ্চল ॥
প্রতিরোধে কাজ করছে হীড বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ টিবি প্রকল্প
প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) ঃ
যক্ষার ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের চা বাগানের শ্রমিকরা। সিলেট বিভাগের প্রায় দেড় শতাধিক চা বাগানের ৭ লক্ষাধিক অধিবাসী বসবাস। চা বাগানের পাশাপাশি অনান্য সমতল ভূমিতেও রয়েছে আরো লক্ষ লক্ষ অধিবাসী। আর চা বাগানে যক্ষা ঝুঁকির পাশা পাশি ছড়িয়ে পড়তে পারে বাগানের বাহিরের জনবসতিতেও। আজ ২৪ মার্চ বিশ্ব যক্ষা দিবস। প্রতি বছরের মত এ বছরে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা হীড বাংলাদেশ সিলেট বিভাগের ৩টি জেলার (মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং সিলেট) প্রতিটি উপজেলা, জেলা সদর ও প্রতিটি চা বাগানে বিশ্ব
য
ক্ষা দিবস পালন করছে। এই বছরের যক্ষা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় “নেতৃত্ব চাই যক্ষা নির্মুলে, ইতিহাস গড়ি সবাই মিলে” বাংলাদেশে যক্ষা একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সমস্যা। আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩ লক্ষের অধিক লোক যক্ষারোগে আক্রান্ত হয় এবং এই রোগের কারনে প্রতি বছর বাংলদেশে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ হাজার লোকের মৃত্যু হয়। চা-শিল্পাঞ্চলের ৩৮টি চা-বাগানে ৯ মাসে (এপ্রিল ২০১৭ থেকে জানুয়ারি ২০১৮) ২ হাজার ৪৯০ জন চা-শ্রমিকের স্বাস্থ্য (কফ ও অন্যান্য) পরীক্ষা করে মোট ৩৯১ জন য²া রোগী শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানান হীড বাংলাদেশ-এর চ্যালেঞ্জ টিবি প্রকল্পের প্রজেক্ট ম্যানেজার সিমন মার্দি।
যক্ষা রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এর ভয়াবহতা বাংলাদেশের জন্য একটি হুমকি হয়ে দাড়াঁবে। যক্ষা একটি জীবানু গঠিত সংক্রামক রোগ ইহা শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে বাতাসের মাধ্যমে মানব দেহে প্রবেশ করে এবং রোগ সৃষ্টি করে। কেবল মাত্র ফুসফুস নয়, মানুষের শরীরের যে কোন অংগে যক্ষারোগ হতে পারে। দুই সপ্তাহের অধিক কাশি, গায়ে জ্বর, ক্ষুদামন্দা এবং শরীরের ওজন কমে যাওয়া যক্ষার প্রাথমিক লক্ষণ। যে কোন মানুষের এ লক্ষণ দেখা দিলে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল,সদর হাসপাতাল, বক্ষ ব্যাধি হাসপাতাল, বিভিন্ন এনজিও হাসপাতাল এবং উপজেলা হাসপাতাল যক্ষা ক্লিনিকে কফ পরীক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল, বক্ষ ব্যাধি হাসপাতাল, বিভিন্ন এনজিও হাসপাতাল এবং উপজেলা হাসপাতাল যক্ষা ক্লিনিকে বিনা মূল্যে যক্ষারোগের চিকিৎসা প্রদান করছে।
হীড বাংলাদেশ ১৯৯৪ সাল থেকে এদের মধ্যে যক্ষা রোগ সচেতনতায় কাজ করছে । চা বাগান এলাকায় ঘনবসতি ও স্যাতসেতে ঘরে বসবাস করার জন্য এসব এলাকায় যক্ষার সংক্রামক বেশি পাওয়া যায়। তাই চা বাগানকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে যক্ষা নিয়ে কাজ করে চলছে চ্যালেঞ্জ টিবি প্রকল্প। হীড বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জে এর কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৭৮ সাল থেকে হীড বাংলাদেশ স্ব-উদ্যোগে দাতা সংস্থার আর্থিক সহায়তায় কমলগঞ্জউপজেলায় যক্ষা নিয়ন্ত্র¿ণ কার্যক্রম শুরু করে।
বিশেষ করে যক্ষা নিয়ন্ত্রণে হীড বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জ টিবি প্রকল্প যেসব কার্যক্রম বাস্তবায়িত করেছে এর মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে চা বাগানের বিভিন্ন পাড়ায় ৫০ জনকে নিয়ে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে পাঠ সহায়িকার মাধ্যমে যক্ষা সম্পর্কে ধারনা থাকার বিভিন্ন তথ্য ও পরার্মশ শিক্ষা দিয়ে আসছে। চা বাগানে বিভিন্ন ভাষা ধর্মী ছোট নৃ-গোষ্ঠী বসবাস করে যেমন, গারো, খাসিয়া, সাওতাল, তেলুগু, উড়িষা ইত্যাদি এই নৃ-গোষ্ঠীর মাঝে যক্ষা সচেতন মূলক সভা আয়োজন করছে । যার মাধ্যমে তারা যক্ষা সম্পর্কে জানতে পারে এবং সুস্থভাবে জীবন যাপন করতে পারে। চা বাগানের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একাংশ মহিলা, যারা বেশিরভাগ অসচেতন, গরিব দিন মুজুর শ্রমিক যাদের অনেকে যক্ষা সম্পর্কে অবগত নন। ২৫ জন মহিলাদের নিয়ে ডিসপেনসারিতে মহিলা সভার আয়োজন করা হয়।
সেখানে যক্ষা কি? কেন হয়? এবং এর থেকে প্রতিকারের উপায় সম্পর্কে বিভিন্ন শিক্ষা দেওয়া হয়। এছাড়াও চা কারখানার শ্রমিকদের নিয়ে সভা, চা বাগানের স্বাস্থ্যকর্মীদের মৌলিক প্রশিক্ষণ, যক্ষা থেকে আরোগ্য লাভকারীদের নিয়ে দেওয়াল লিখন, লোকসঙ্গীত, নাটক ও উপজেলা ভিত্তিক, উপজেলা এ্যাডভোকেসি মিটিং করা হয়। যেখানে সরকারি ইউএইচসি কর্মকতার সভাপত্বিতে ৩০ জন স্বাস্থ্যকর্মী উপস্থিতিতে যক্ষা সম্পর্কে বিভিন্ন দিকনিদের্শনা দিয়ে থাকেন।
হীড বাংলাদেশ বিগত ১৯৮৫ সন হতে যক্ষারোগের চিকিৎসা সহ বিভিন্ন ধরনের জনসচেতন মুলক কাজ করে যাচ্ছে যার ফলশ্রতিতে অনেক লোক যক্ষা থেকে রক্ষা পেয়েছে তথাপি এখনও যক্ষা রোগের প্রবণতা কমে নাই। অপুষ্টি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সচেতনতার অভাব, দারিদ্রতা এই রোগ বিস্তারে বিশেষ অন্যতম কারণ। হীড বাংলাদেশ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিগত বছরে (জানুয়ারী হতে ডিসেম্বর -২০১৭) রোগীর তথ্য মৌলভীবাজার ৪৬৮৮ জন, হবিগঞ্জে ৪৭৭৬ জন এবং সিলেট জেলায় ৫২৩৯ জন এই ৩ টি জেলায় সব ধরনের যক্ষারোগীর সর্বমোট-১৪৭০৩ জন। বাংলাদেশে অন্য বিভাগগুলির তুলনায় সিলেট বিভাগ যক্ষা রোগের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এর একটি অন্যতম কারন এ অঞ্চল চা বাগান দ্বারা বেষ্টিত এবং চা বগান গুলিতে টিবি রোগী সনাক্ত করণের রেটও অনেক বেশি। হীড বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ টিবি প্রকল্প প্রতিটি চা বাগানে মাঠ কর্মীর মাধ্যমে রোগী খুঁজে বের করে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসছে ও বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে য²া রোগ সম্পর্কিত সচেতনতা প্রচার কাজ করছে। য²ারোগীদের ডটস এর মাধ্যমে ঔষধ খাওয়ানো হয়। নিয়মিত পরিমিত ও ক্রমাগত চিকিৎসা প্রদানে যক্ষাারোগ আরোগ্য হয়। কিছু সংখ্যক অবহেলা জনিত কারনে ও নিয়মিত ঔষধ সেবন না করায় এমডিআর নামক একটি কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে যার চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি ও কষ্ট সাধ্য। হীড বাংলাদেশ এর চ্যালেঞ্জ টিবি প্রকল্প মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার ১৫টি উপজেলার ১৮৪টি চা বাগান, ৭২টি খাসিয়া পুঞ্জি ও ৫৪টি রাবার বাগানে যক্ষা নিয়ন্ত্রনে কাজ করছে। নিজে এবং সমাজ সুুস্থ্য রাখতে যক্ষা নির্মুল করতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
হীড বাংলাদেশ এর একার পক্ষে ৩টি জেলার সকল রোগীর সনাক্ত করে চিকিৎসা সম্পন্ন করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। যদি অত্র এলাকার সকল জনগন সচেতন হয় এবং সন্দেহজনক রোগী হাসপাতালে পাঠায় ও সকল সরকারি বেসরকারি স্বাস্থ্য কর্মীগন যক্ষামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অংঙ্গীকারাবদ্ধ হয়, তবেই এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ের সফলতা আসবে।
আগেকার দিনে যক্ষা ছিল মারাত্বক একটি ঘাতক ব্যাধি। বলা হত যার হয় যক্ষা, তার নাই রক্ষা। এখন বলা হয় “যক্ষা হলে রক্ষা নাই, এ কথার ভিত্তি নাই। ” প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই যক্ষা বা টিউমারকুলোসিস মানুষকে আক্রান্ত করেছে আজ ক্যান্সার কিংবা এইডস যেমন মানব সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। এক সময় যক্ষা, কুষ্ঠ কিংবা প্লেগ ছিল তেমনি। বলা হয়ে থাকে চুল, নখ এবং দাঁত ছাড়া শরীরের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে যক্ষা হতে পারে না। যক্ষা দু’ধরণের হলেও শতকরা ৮০ ভাগ রোগীই ফুসফুসের যক্ষায় ভোগে। যে সব সংক্রামক ব্যধি মহামারি আকারে মানব সমাজে বিস্তার লাভ করেছে তার মধ্যে যক্ষা সর্বাধিক জ্বরা ও মৃত্যুর জন্যে দায়ী।






