শবে বরাত ফজিলতপূর্ণ রাত
সাদিকুর রহমান
শব অর্থ রাত বরাত অর্থ ভাগ্য—অতএব এর সমষ্টিগত অর্থ হলো ভাগ্যের রাত বা ভাগ্য নির্ধারণের রাত। শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতই শবে বরাতের রাত। শাবান অর্থ শাখা-প্রশাখা হওয়া। অর্থাৎ মাহে রমজানের অবারিত কল্যাণ ও বরকত হাসিলের বিভিন্নমুখী দ্বার খুলে দেওয়া হয়। আর তাই রসুলে করিম (স.) রজব মাস থেকে দোয়া করেছেন। হে আল্লাহ, রজব ও শাবানের অবারিত কল্যাণ ও বরকত দান কর এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছার তৌফিক দান করুন।
শবে বরাতে ইবাদত-বন্দেগী করা নির্ভরযোগ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। রাসুল সা. ও সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগ থেকে অদ্যবধি এ রাতে বিশেষভাবে নফল ইবাদত ধারাবাহিকতার সাথে চলে আসছে। ইদানিং এক শ্রেণির লোক বাংলায় হাদীস পড়া ছাড়া যাদের কুরআন-হাদীসের আবশ্যিক কোনো জ্ঞান নেই। তারা নিজেদের অতিগবেষণার মাধ্যমে ইসলামের সুপ্রমাণিত বিষয়গুলোকে জনসাধারণের মাঝে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। তারা বলছে শবে বরাতের হাদীসগুলো সহীহ নয়, এ রাতে ইবাদত করা বিদআত, ইত্যাদি,ইত্যাদি। অথচ শবেবরাত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হওয়ার পরও বিদআত বলাটা হাদীস সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচায়ক। আর জেনে এমনটি বলে থাকলে রাসূল সাঃ এর হাদীস অস্বীকারের মতো মারাত্মক অপরাধে অপরাধী সে ব্যক্তি। রাসূল (সাঃ)এর হাদীসের প্রতি বিদ্বেষী হওয়া ছাড়া হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এ ফযীলতপূর্ণ রাতকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না।
রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-যখন শাবান মাসের অর্ধেকের রজনী আসে [শবে বরাত] তখন তোমরা রাতে নামায পড়, আর দিনের বেলা রোযা রাখ। নিশ্চয় আল্লাহ এ রাতে সূর্য ডোবার সাথে সাথে পৃথিবীর আসমানে এসে বলেন-কোন গোনাহ ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি আমার কাছে? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। কোন রিজিকপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দিব। কোন বিপদগ্রস্থ মুক্তি পেতে চায় কি? আমি তাকে বিপদমুক্ত করে দিব। আছে কি এমন, আছে কি তেমন? এমন বলতে থাকেন ফযর পর্যন্ত।
হযরত আয়শা রাঃ বলেন-এক রাতে রাসূল সাঃ কে না পেয়ে খুজতে বের হলাম। খুঁজতে খুঁজতে জান্নাতুল বাকীতে [মদীনারত কবরস্থান] গিয়ে আমি তাঁকে দেখতে পেলাম। তিনি বললেন-কি ব্যাপার আয়শা? [তুমি যে তালাশে বের হলে?] তোমার কি মনে হয় আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল তোমার উপর কোন অবিচার করবেন? [তোমার পাওনা রাতে অন্য কোন বিবির ঘরে গিয়ে রাত্রিযাপন করবেন?] হযরত আয়শা রাঃ বললেন- আমার ধারণা হয়েছিল আপনি অন্য কোন বিবির ঘরে গিয়েছেন। রাসূল সাঃ তখন বললেন-যখন শাবান মাসের ১৫ই রাত আসে অর্থাৎ যখন শবে বরাত হয়, তখন আল্লাহ পাক এ রাতে প্রথম আসমানে নেমে আসেন। তারপর বনু কালব গোত্রের বকরীর পশমের চেয়ে বেশী সংখ্যক বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দেন’।
শবে বরাতের রজনীতে করণীয়:
রাত জেগে ইবাদত করা ও পরদিন রোজা রাখা। হজরত আলী (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ১৫ শাবানের রাত যখন হয়, তোমরা রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে পালন করো এবং দিনের বেলা রোজা রাখো। কেননা এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে এসে বলেন, কোনো মাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে মা করে দেব। কোনো রিজিক অন্বেষণকারী আছে কি? আমি তাকে রিজিক প্রদান করব। আছে কি কোনো রোগাক্রান্ত? আমি তাকে আরোগ্য দান করব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে তাদের ডাকতে থাকেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হা. ১৩৮৮)।
শবে বরাতে করণীয়
শবে বরাতের বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তা কোরআন শরিফ ও হাদিসের আলোকে প্রমাণিত। আমরা আল্লাহর বান্দা। বন্দেগিই আমাদের কাজ। বান্দার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট দিন ও রাত আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন। আশুরার দিন, আরাফার দিন, জুমার দিন। রাতের মধ্যে শবে কদর, শবে বরাত, দুই ঈদের রাত। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তেমনি এসব দিন ও রাত। মূলত এই দিবস ও রজনী আমাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় নবী (স.)-কে দেওয়া আল্লাহর বিশেষ উপহার। এসব উপহারের মর্যাদা যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে গুনাহ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের সৌভাগ্য অর্জন করা আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
লেখক : সহকারী শিক্ষক, শ্রীমঙ্গল আইডিয়াল স্কুল






