আজ-  ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ১লা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি


সময় শিরোনাম:
«» বগুড়ায় ২,৫০০ লিটার ডিজেল জব্দ, ব্যবসায়ীকে জরিমানা: পরে কৃষকদের মাঝে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি «» নানিয়ারচর সেনাবাহিনীর উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের বিদায়ী সংবর্ধনা ও শিক্ষা সামগ্রী উপহার «» কমলগঞ্জে চুরির অপবাদে বাঁধা হাত-পায়ে নির্মম নির্যাতন: ভাইরাল ভিডিও ঘিরে ক্ষোভ «» শ্রীমঙ্গলে হাইল হাওড়ে মৎস্যজীবীদের জালে ১০ ফুট লম্বা অজগর «» মৌলভীবাজার ইনসানিয়া স্পেশালাইজড হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শুভ উদ্বোধন «» হাউজ অব লর্ডসে মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা প্রদান, ইতিহাস সংরক্ষণ ও ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষায় জোর দাবি «» ঝুঁকির সাঁকো, মৃত্যুর নদী—মনু পারাপারে এখনও রশিটানা নৌকার ভরসা, সেতুর দাবিতে ক্ষোভে ফুঁসছে জনপদ «» শ্রীমঙ্গলে চা স্বাদ নির্ণয় ও মান নিয়ন্ত্রণে ৬ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ শুরু «» শ্রীমঙ্গলে খাল খনন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন «» কমলগঞ্জে প্রাথমিক শিক্ষার বেহাল দশা; বৃত্তি পরীক্ষায় অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা

ঝুঁকির সাঁকো, মৃত্যুর নদী—মনু পারাপারে এখনও রশিটানা নৌকার ভরসা, সেতুর দাবিতে ক্ষোভে ফুঁসছে জনপদ


ব্রীজের ছবি কাল্পনিক মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী, ক্রাইম রিপোর্টার :মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইকুঁড়া ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে যাওয়া মনু নদ যেন এক নীরব বিভাজন রেখা। 
একপাড়ের মানুষকে আরেকপাড়ে যেতে প্রতিদিন লড়তে হয় জীবনঝুঁকির সঙ্গে। আধুনিকতার যুগেও এখানে নেই একটি নিরাপদ সেতু—ভরসা বলতে শুধুই রশিটানা নৌকা আর নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো।
সিলেট-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা কাজিরবাজার এলাকায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই নদ পারাপার করেন। স্থানীয়দের ভাষায়, “এটা আর নদী না, আমাদের জন্য প্রতিদিনের ভয়।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে হাঁটুজল নদী পেরোতে বাঁশের সাঁকোই ভরসা। আর বর্ষা এলেই সেই পথ হয়ে ওঠে মৃত্যু ফাঁদ—তখন ব্যবহার করতে হয় রশিটানা নৌকা। তীব্র স্রোত, ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে এই নৌকা পারাপার যেন জীবনের সঙ্গে জুয়া খেলার মতো।মিরপুর, পালপুর, সুমারাই, আমুয়া, চাঁনপুরসহ অন্তত ৮টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। 
শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ—কেউই এই দুর্ভোগ থেকে মুক্ত নন। প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থী স্কুল-কলেজে যেতে এই নদ পার হন, অনেক সময় আবহাওয়ার কারণে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।

স্থানীয় কৃষকদের জন্য দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ। শাওয়াইজুড়ী ও কাউয়াদীঘি হাওরে উৎপাদিত ধান, সার-বীজসহ কৃষিপণ্য পরিবহনে তাদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত খরচ ও ভোগান্তি।

কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—এই নদ ইতোমধ্যেই কেড়ে নিয়েছে একাধিক প্রাণ। রশিটানা নৌকা ডুবে এক স্কুলছাত্রীসহ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। আরও অনেকেই আহত হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। তবুও যেন কারও টনক নড়েনি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সেতু নির্মাণের দাবিতে স্মারকলিপি, মানববন্ধন, বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিগত সরকারের আমলেও বারবার দাবি তোলা হয়েছে, আশ্বাস মিলেছে—কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি কিছুই। সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু পরিবর্তন হয়নি এই জনপদের ভাগ্য।

তবে স্থানীয়দের স্মৃতিতে এখনও টাটকা এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৯৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময়ে অর্থমন্ত্রী মরহুম এম. সাইফুর রহমান কাজিরবাজার এলাকায় এক কর্মসূচিতে এসে মনু নদ পরিদর্শন করে বলেছিলেন—এই স্থানে একটি সেতু অত্যন্ত প্রয়োজন। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্ন আজও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। মরহুম এম. সাইফুর রহমানের ছেলে এম. নাসের রহমান বর্তমানে মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। 
ফলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—সফল অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে পরিচিত এম. সাইফুর রহমান যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই কাজিরবাজার মনু নদে সেতু নির্মাণের স্বপ্ন কি এবার বাস্তবে রূপ নেবে?
একজন ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা কি এই দেশের নাগরিক না? প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হবে—এটা কোন যুগে আছি আমরা?”
মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান জানান, কাজিরবাজার এলাকার মনু নদের ওপর ব্রিজ নির্মাণ এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। তিনি বলেন, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি ব্রিজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের একটাই দাবি—কাজিরবাজার এলাকায় মনু নদে দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হোক। শুধু মানুষের চলাচল নয়, অর্থনীতি, শিক্ষা ও নিরাপত্তার স্বার্থেও এটি এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।

এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন—আর কত প্রাণ ঝরলে সরকারের টনক নড়বে? নাকি ইতিহাসের সেই প্রতিশ্রুত সেতু বাস্তবে রূপ নিতে এবার সত্যিই কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাবে?