আজ-  ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ - ১৮ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি


সময় শিরোনাম:
«» কমলগঞ্জ উপজেলা তালামীযের ঈদ পুনর্মিলনী ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত। «» State-sponsored Legal Protection and Impunity to Corruption: TIB «» জুড়ীতে মোবাইল কোর্ট এর অভিযানে ৫৫০ কেজি পোনা মাছ জব্দ ও অর্থদণ্ড আদায়  «» বগুড়া আদমদীঘিতে বজ্রপাতে এক যুবকের মৃত্যু «» কমলগঞ্জে কমলকুঁড়ি পত্রিকার ১৬তম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও কেক কাটা অনুষ্ঠিত «» দেশ ও বিদেশে মৌলভীবাজার সংগঠনের উদ্যোগে গরিব ও পথচারী মানুষের মধ্যে মাংস ও নগদ টাকা বিতরণ «» পুলিশ-প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা: ৪ মোবাইল ও ৩৮ সিমসহ গ্রেফতার ১ «» ফলোআপ – ছালামিটিলা সড়ক সংস্কার কাজ শিগগিরই শুরু হবে — প্যানেল চেয়ারম্যান আহমদ আলী «» মৌলভীবাজারে বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে শ্রেষ্ট প্রধান শিক্ষক সত্যজিৎ পাশী «» নান্দনিক শহর মৌলভীবাজারের ০১ নং পর্যটন স্পটের বেহাল দশা কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা!!!!

কোনোদিনই এলাকাবাসীকে মুক্তি দেয়নি, মনু ও কুশিয়ারা নদী, চাম্পা লালে সম্পদসহ শত মানুষের ঘরবাড়ি দু-নদীর গর্ভে


মনুমুখ বাজারের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মনুনদী ও কুশিয়ারা নদীর মিলনস্থলে গড়ে উঠেছিল এক ঐতিহ্যবাহী জনপদ—মনুমুখ বাজার। মনু নদীর পশ্চিম পাড়ে এবং কুশিয়ারা নদীর দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত এই বাজারটি একসময় ছিল বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র। নদীপথে যোগাযোগ সহজ হওয়ায় মনুমুখ বাজারে প্রতিদিন শত শত মানুষ লঞ্চ, নৌকা ও পালতোলা নৌকায় করে আসতেন কেনাকাটা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে। সেই সময় বাজারটি ছিল জমজমাট এবং প্রাণবন্ত।

ব্রিটিশ আমলে মনুমুখ বাজারের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। এখানে নির্মিত হয়েছিল একটি রেস্ট হাউস, যেখানে ব্রিটিশ ও বিদেশি ব্যবসায়ী, বিশেষ করে সাদা চামড়ার লোকজন এসে অবস্থান করতেন। নদীপথে আসা বিদেশি জাহাজের যাত্রী ও কর্মকর্তাদের নিয়মিত আনাগোনা ছিল এই বাজারে। কুশিয়ারা নদী তখন ছিল বিশাল ও গভীর, যার বুক চিরে বড় বড় বিদেশি জাহাজ সহজেই মনুমুখে পৌঁছাতে পারত।

মনুমুখ বাজারের গৌরবময় ইতিহাসের বড় সাক্ষী হলো ব্রিটিশ আমলের বিখ্যাত ব্যবসায়ী চম্পা লাল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ছিল ২২টি পাটের গুদাম, যা সে সময় এলাকার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল। এসব গুদামে প্রতিদিন শত শত শ্রমিক কাজ করতেন। সকালবেলা কুশিয়ারা নদীর পাড়ে দাঁড়ালে দেখা যেত বিশাল জাহাজ ভিড়েছে, গুদাম থেকে পাট বোঝাই করে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ দৃশ্য ছিল মনুমুখের ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক।

বাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছিল ব্রিটিশ আমলের পোস্ট অফিস। তখনকার দিনে সব ধরনের চিঠিপত্র, টাকা পাঠানো ও লেনদেনের প্রধান মাধ্যম ছিল এই পোস্ট অফিস। আশপাশের এলাকার বহু মানুষ জীবিকার তাগিদে বিদেশে থাকতেন, ফলে মনুমুখ পোস্ট অফিস ছিল অত্যন্ত ব্যস্ত ও জনসমাগমপূর্ণ।

শিক্ষাক্ষেত্রেও মনুমুখ বাজার ছিল ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ। এখানে প্রতিষ্ঠিত মনুমুখ পি.টি. বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ছিল সেদিনকার সময়ের অন্যতম “গ্রেট স্কুল” হিসেবে পরিচিত। শুধু মনুমুখ নয়, বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, নবীগঞ্জসহ দূরদূরান্তের ছাত্ররা এখানে পড়াশোনা করতে আসতেন। পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা, জাতীয় অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক আয়োজনসহ সব ধরনের প্রতিযোগিতায় এই বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করত। বিদ্যালয়ের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও গর্বের।

চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও মনুমুখ বাজারের ভূমিকা ছিল অনন্য। এখানে ছিল মনুমুখ সরকারি হাসপাতাল, যেখানে দক্ষ ডাক্তার ও নার্সরা কর্মরত ছিলেন। হাসপাতালের পাশে তাদের থাকার জন্য আলাদা কোয়ার্টারও ছিল। আশপাশের বহু গ্রামের মানুষ চিকিৎসা নিতে নিয়মিত এই হাসপাতালে আসতেন।

মনুমুখ বাজারের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। হাসপাতালের পাশেই একটি ঐতিহাসিক মাজার ছিল, যেখানে প্রতিবছর উরস ও মেলা অনুষ্ঠিত হতো। এই মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকার হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটত। এছাড়াও এখানে অনুষ্ঠিত হতো বিখ্যাত বার্ষিক ঐতিহাসিক মাছের বাজার, যা ছিল মনুমুখের আরেকটি বড় ঐতিহ্য। কাউয়া দিঘী, বিভিন্ন বিল-হাওর ও কুশিয়ারা নদী থেকে আসা নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত এই বাজারে। বিশেষ করে কুশিয়ারা নদীর ইলিশ, বড় বুয়াল ও বাঘ মাছ ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।

মনুমুখ বাজারে তখন কৃষিপণ্য, ধান-চাল, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে কাপড়, টেইলারিং সামগ্রী সবই পাওয়া যেত। ছিল নামকরা আখাই মিয়ার মিষ্টির দোকান, কাপড়ের দোকান এবং অসংখ্য টেইলার দোকান। বাজারে ছিল লঞ্চঘাট ও নৌকা ঘাট, যা আজও কিছুটা অস্তিত্ব ধরে রেখেছে।

কিন্তু সময়ের নির্মম পরিবর্তনে এই সমৃদ্ধ জনপদের ভাগ্যে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে মনু নদী ও কুশিয়ারা নদীতে শুরু হয় ভয়াবহ ভাঙন। প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হতে থাকে একের পর এক গ্রাম ও স্থাপনা। খালপার গ্রাম, চানপুর, সোমারাইসহ বহু এলাকা এবং চম্পা লালের ঐতিহাসিক ২২টি পাটের গুদামসহ পুরো মনুমুখ বাজার ধীরে ধীরে ভেঙে নদীতে তলিয়ে যায়।

আজ মনুমুখ বাজারের সেই জৌলুস আর নেই। কুশিয়ারা ও মনু নদীর গর্ভে হারিয়ে গেছে শত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কর্মব্যস্ত জনজীবন। এখন শুধুই রয়ে গেছে দুই নদীর নাম, কিছু স্মৃতি, আর বয়স্ক মানুষের চোখেমুখে ভেসে ওঠা হারিয়ে যাওয়া মনুমুখ বাজারের গল্প।

মনুমুখ বাজার আজ নদীর বুকে বিলীন হলেও তার ইতিহাস এখনো মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে বেঁচে আছে—এক গৌরবময় অতীতের স্মৃতি হয়ে।